বাগেরহাট প্রতিনিধি

বিকেলে বাবার দাফন। রাতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালন। পরদিন সকালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া। বাবাকে হারানোর শোক বুকে নিয়েই এমন কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বাগেরহাটের শিক্ষার্থী ইকনকে। তাঁর এই সংগ্রামের খবর প্রকাশের পর পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

বুধবার (২২ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ফারহান ইশতিয়াক ফোনে ইকনের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রী নিজেই ইকনের সঙ্গে কথা বলবেন। আপাতত তাঁর প্রয়োজন বিবেচনায় দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। একই সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষা শেষে ইকনের উচ্চশিক্ষাসহ ভবিষ্যতের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রীর পিএস ফারহান ইশতিয়াক বলেন, ‘ইকনের খবরটি আমাদের নজরে এসেছে। মন্ত্রী বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। আপাতত তাঁর জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরীক্ষা শেষে যেন অর্থের অভাবে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’

ইকনের সংগ্রামের গল্প সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তা ব্যাপক সাড়া ফেলে। দেশ-বিদেশের অনেক মানুষ তাঁর খোঁজখবর নেন এবং সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এর মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর এই উদ্যোগ ইকন ও তাঁর পরিবারের জন্য নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে।

ঘটনাটি ঘটে এইচএসসি পরীক্ষার সময়। সেদিন সকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ইকনের বাবা ইসরাফিল দাড়িয়া। দুপুরে তিনি মারা যান। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে মুহূর্তেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায় পরিবারটি।

ইসরাফিল মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালাতেন। তাঁর এক ছেলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। অসুস্থ ছেলেকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করেন ইকনের মা। ফলে পরিবারের যাবতীয় দায়িত্ব ছিল বাবার ওপর।

বাবাকে হারানোর পর সেই দায়িত্ব এসে পড়েছে ইকনের কাঁধে। বাগেরহাট শহরে চার হাজার টাকা ভাড়ার একটি বাসায় মা, অসুস্থ ভাই ও নিজেকে নিয়ে এখন তাঁদের সংসার।

ইকনের দাদা একসময় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাগেরহাটে গাড়িচালকের চাকরি করতেন। চাকরি থেকে অবসরের পর তিনি গোপালগঞ্জে ফিরে গেলেও ইকনের বাবা বাগেরহাটেই থেকে যান। সেখানেই মোটরসাইকেল চালিয়ে পরিবারের খরচ চালাতেন।

বাবার ওপর সংসারের চাপ কিছুটা কমাতে পড়াশোনার পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে রাতের নিরাপত্তাকর্মীর কাজ নেন ইকন। মাসে তাঁর আয় মাত্র আট হাজার টাকা।

অর্থাভাবে এ বছর প্রয়োজনীয় বইও কিনতে পারেননি তিনি। তারপরও পড়াশোনা থামিয়ে দেননি। নিজের ভবিষ্যৎ বদলানোর স্বপ্নে কোরিয়ান ও চীনা ভাষাও শিখেছেন। তাঁর আশা, পড়াশোনার পাশাপাশি এসব দক্ষতা একদিন তাঁকে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে।

ইকনের মামা মানিক মোল্লা বলেন, ‘আমাদের পরিবারের জন্য এটি খুবই কঠিন সময়। ইকনের বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের সব দায়িত্ব যেন হঠাৎ করেই তাঁর কাঁধে এসে পড়েছে। কিন্তু এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সে পড়াশোনা ছাড়েনি।’

ইকনের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। যারা ইকনের খবর প্রকাশ করেছেন এবং সংবাদটি দেখে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা বিশ্বাস করি, সবার সহযোগিতায় ইকন তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে এবং একদিন বাবার স্বপ্ন পূরণ করবে।’

বাবাকে হারানোর শোক এখনো সামলে উঠতে পারেনি ইকন। এর মধ্যেই তাঁকে ভাবতে হচ্ছে সংসার ও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

ইকন বলেন, ‘বাবার ওপর চাপ কমানোর জন্যই আমি আট হাজার টাকা বেতনে এটিএম বুথে চাকরি নিয়েছিলাম। অর্থের অভাবে এ বছর নিজের বইও কিনতে পারিনি। আমি কোরিয়ান ও চীনা ভাষাও শিখেছি। গরিবের ছেলে হিসেবে আমাকে নিজের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।’

বাবার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইকন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো বাবাকে আমার পড়াশোনার খরচ নিয়ে চাপ দিতে চাইনি। বাবা আমাদের সুখের জন্য সারাজীবন কষ্ট করেছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বাবা চলে গেলেন। বাবাকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। যার বাবা নেই, সে-ই শুধু বাবা হারানোর বেদনা বুঝতে পারে। বাবা ছিলেন আমাদের জীবনের বটগাছ।’

বাবার সেই ছায়া হারিয়ে এখন ইকনের সামনে কঠিন পথ। তবে তাঁর সংগ্রামের গল্পে যেভাবে মানুষের সহমর্মিতা তৈরি হয়েছে এবং শিক্ষামন্ত্রী পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে নতুন করে আশার আলো দেখছে পরিবারটি।

 

প্রথম আলো